• 09 Feb, 2026

চিত্রানদী: নড়াইল শহরের প্রাণ ও প্রান্তরের সাক্ষ্য

চিত্রানদী: নড়াইল শহরের প্রাণ ও প্রান্তরের সাক্ষ্য

নড়াইল শহরের গা ঘেঁষে বয়ে চলা চিত্রানদী শুধু একটি জলপ্রবাহ নয়, এটি এ অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একদিকে যেমন এটি ভূগোলের ভাষায় নদী, অন্যদিকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ভালোবাসা, শৈশব, স্মৃতি ও আত্মপরিচয়ের প্রতিচ্ছবি।

চিত্রানদীর উৎস মাথাভাঙ্গা নদী। মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলার গড়েরঘাট নামক স্থান থেকে নদীটি যাত্রা শুরু করে। এরপর এটি নড়াইল শহরকে ছুঁয়ে কালিয়া উপজেলার একটি অংশ টপকে গাজিরহাট এলাকায় মিলেছে নবগঙ্গার সঙ্গে। এই নদী পথ শুধু জলধারার নয়, এটি বহু মানুষের জীবিকা, সংস্কৃতি এবং আবেগেরও পথ।

সবুজের বেষ্টনীতে চিত্রা 
চিত্রার দুই ধারে ছড়ানো সবুজের চাদরে ঢাকা বসতি ও গাছগাছালির সমাহার নদীটিকে করে তুলেছে অপূর্ব এক দৃশ্যপটের অংশ। সকাল-সন্ধ্যায় নদীর তীরে হাঁটতে গেলে যে কেউ মুগ্ধ না হয়ে পারবে না। নারিকেল, খেজুর, কাঁঠাল ও আমগাছের ছায়ায় নদীর পাড় যেন কবিতার পাতায় আঁকা এক ছবির মতো লাগে। চিত্রানদীর স্রোতধারায় বয়ে চলে সময়, আর পাড়ঘেঁষা বসতিগুলো সেই সময়ের নিঃশব্দ সাক্ষী।

এই নদীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো মানুষের জীবনের নানা গল্প। অনেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন, কেউবা নদীতে নৌকা বাইচের আয়োজন করেন উৎসবের আমেজে। চিত্রার স্রোতের সঙ্গে মিশে আছে আনন্দ-বেদনা, বেঁচে থাকার সংগ্রাম আর হারিয়ে যাওয়া দিনের স্মৃতি।

জোয়ার-ভাটার খেলা 
চিত্রানদী এখনও তার প্রাকৃতিক নিয়মে জোয়ার-ভাটার খেলা চালিয়ে যাচ্ছে। নদীর জলস্তর দিনে কয়েকবার ওঠানামা করে, যা এই অঞ্চলের কৃষি ও জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। অনেক সময় ভাটার সময় দেখা যায় নৌকা তীরে আটকে গেছে, আবার জোয়ার এলে নদী জীবন্ত হয়ে ওঠে।

এই জোয়ার-ভাটার সঙ্গে একসময় গ্রামের মানুষের জীবনের তাল মিলিয়ে চলত। কৃষিকাজ, মাছ ধরা, এমনকি পারাপারও নির্ভর করত জলের ওঠানামার ওপর। কিন্তু সময় বদলে গেছে, বদলে গেছে মানুষও।

নদী সংকটের গল্প 
যতই রূপকথার মতো মনে হোক, বাস্তবতা হলো চিত্রানদী আজ সংকটাপন্ন। এক সময় যে নদী ছিল প্রমত্তা, সে আজ সংকুচিত, নিঃস্ব প্রায়। কিছু অসাধু ব্যক্তি নদীর জায়গা দখল করে অবৈধভাবে ঘরবাড়ি, দোকান, গুদাম নির্মাণ করছে। কোথাও কোথাও নদীর বুকেই মাটি ভরাট করে গড়ে তোলা হচ্ছে রাস্তা কিংবা মার্কেট।

নদীতে যত্রতত্র ফেলা হচ্ছে আবর্জনা। পলিথিন, প্লাস্টিক, মৃত প্রাণী থেকে শুরু করে ইট-বালু সবই নদীর বুকে ফেলছে মানুষ। এক সময় যেখানে স্বচ্ছ জলধারা বইত, সেখানে আজ ঘোলা পানি, দুর্গন্ধ আর কচুরিপানার স্তূপ।

নদীর গভীরতা কমে গেছে আশঙ্কাজনক হারে। বর্ষায় একটু বেশি বৃষ্টি হলে আশেপাশের এলাকা প্লাবিত হয়, আবার শুকনো মৌসুমে নদী হয়ে পড়ে মৃতপ্রায়। জলজ জীববৈচিত্র্য কমে যাচ্ছে, মাছের প্রজাতির সংখ্যাও হ্রাস পাচ্ছে।

04-epril-2025-02-nrailknth.jpgনদী রক্ষায় উদাসীনতা 
সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, এই নদী রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি কিংবা প্রভাবশালী নাগরিকদের কাছ থেকে কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। মাঝে মাঝে কয়েকটি সামাজিক সংগঠন নদী পরিষ্কার অভিযানের মতো কর্মসূচি হাতে নিলেও, তা স্থায়ী বা প্রভাবশালী কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি।

প্রয়োজন ছিল একটি সম্মিলিত উদ্যোগের—নদী রক্ষায় সামাজিক সচেতনতা, প্রশাসনিক তৎপরতা ও আইনি ব্যবস্থা একসঙ্গে কাজ করলেই কেবল রক্ষা করা সম্ভব এই প্রাকৃতিক সম্পদকে।

ভবিষ্যতের নদী: সম্ভাবনা ও স্বপ্ন 
যদি এখনই উদ্যোগ নেওয়া যায়, তবে চিত্রানদী আবারও ফিরে পেতে পারে তার পুরনো গৌরব। নদীর খনন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, আবর্জনা ফেলার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন এবং নদীর পাড়ে বৃক্ষরোপণ—এই সবকিছু সম্মিলিতভাবে করলে চিত্রা আবার হাসবে।

চিত্রানদীকে ঘিরে গড়ে তোলা যেতে পারে একটি নদী-কেন্দ্রিক পর্যটন এলাকা। নৌকাবিহার, নদীর পাড়ে ওয়াকওয়ে, শিশুপার্ক, কিংবা হ্যান্ডিক্রাফট মার্কেট—এসব আয়োজন কেবল নদীকে বাঁচাবে না, বরং অর্থনীতিকেও প্রাণ দেবে।

একটি পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব নদীকেন্দ্রিক উন্নয়ন মডেল হতে পারে চিত্রার মাধ্যমে। যেমন ঢাকার বুড়িগঙ্গা বা কোলকাতার হুগলি নদী ঘিরে হয়েছে কিছু প্রকল্প, তেমনি নড়াইলেও চিত্রানদীকে ঘিরে হতে পারে অনুরূপ উদ্যোগ।


শেষ কথা 
চিত্রানদী কেবল একটি নদী নয়, এটি একটি অঞ্চল, একটি সমাজ, একটি সময়কে ধারণ করে আছে। আমরা যদি এই নদীকে হারিয়ে ফেলি, তবে শুধু জলধারা নয়, হারিয়ে ফেলব আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যতের অনেক সম্ভাবনা।

নদীকে ভালোবাসা মানে নিজেকে ভালোবাসা। নদীকে বাঁচানো মানে প্রজন্মকে বাঁচানো। আসুন, চিত্রার পাশে দাঁড়াই। তাকে আবার জীবন্ত, প্রাণবন্ত, সুস্থ ও স্বচ্ছ করে তুলি। নদী আবার গান গাইবে, মানুষ আবার সেই গানে সুর মিলাবে।

কাজী হাফিজুর রহমান, সম্পাদক, নড়াইলকণ্ঠ : ০৪ এপ্রিল ২০২৫