একুশে পদকপ্রাপ্ত বিশিষ্ট ভাস্কর, চিত্রশিল্পী ও শিল্পশিক্ষক হামিদুজ্জামান খান ২০ জুলাই ২০২৫ রবিবার সকালে ঢাকার ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি...রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর। তিনি ডেঙ্গু ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১৫ জুলাই ২০২৫ থেকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
১৯৪৬ সালের ১৬ মার্চ কিশোরগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন এই বরেণ্য শিল্পী। ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউট (বর্তমান চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে তিনি উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। কর্মজীবনের দীর্ঘ সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন (১৯৭০–২০১২)।
ফর্ম, বিষয়ভিত্তিক এবং নিরীক্ষাধর্মী ভাস্কর্যে তাঁর রয়েছে বিশাল অবদান। ১৯৮৮ সালে সিউলের অলিম্পিক ভাস্কর্য পার্কে তাঁর ‘স্টেপস’ ভাস্কর্য আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হয়। এরপরে বিশ্ব পরিসরে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কিছু ভাস্কর্যের মধ্যে রয়েছে—
🔹 ‘জাগ্রত বাংলা’ (আশুগঞ্জ সার কারখানা),
🔹 ‘হামলা’ (সিলেট ক্যান্টনমেন্ট),
🔹 ‘সংশপ্তক’ (জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়),
🔹 ‘শান্তির পায়রা’ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র),
🔹 ‘বিজয় কেতন’ (ঢাকা সেনানিবাস),
🔹 ‘ইউনিটি’ (বাংলাদেশ ব্যাংক ভবন প্রাঙ্গণ),
🔹 ‘পাখি পরিবার’ (বঙ্গভবন)।
চিত্রকলায় তিনি জলরঙ ও অ্যাক্রেলিকে নিসর্গ ও মানবদেহকে বিমূর্ততায় উপস্থাপন করতেন অসাধারণ মুন্সিয়ানায়।
২০১৭ সালে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে ‘হামিদুজ্জামান খান ১৯৬৪–২০১৭’ শিরোনামে তাঁর রেট্রোস্পেকটিভ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর একক প্রদর্শনীর সংখ্যা ৪৭টি। ২০০৬ সালে তিনি একুশে পদক এবং ২০২২ সালে বাংলা একাডেমি ফেলোশিপ লাভ করেন।
🏛️ খুলনা আর্ট একাডেমির শ্রদ্ধাঞ্জলি:
প্রয়াত হামিদুজ্জামান খানের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে খুলনা আর্ট একাডেমি। এই প্রতিষ্ঠানে তাঁর জীবনী ও শিল্পকর্ম দীর্ঘদিন ধরে চারুকলায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের পাঠ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত। এখন পর্যন্ত একাডেমির ১৬টি ব্যাচের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ২২২ জন বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলায় ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছে, যার পেছনে তাঁর অনুপ্রেরণা বিশেষভাবে কাজ করেছে।
একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাস বলেন— “নবীন প্রজন্ম তাঁর কর্ম ও জীবন থেকে শিখে দেশের শিল্পচর্চায় ভূমিকা রাখছে। তিনি আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি আমাদের মাঝে আজীবন বেঁচে থাকবে। শিল্পীদের মৃত্যু হয় না—তাঁরা রয়ে যান তাঁদের শিল্পের মধ্যেই।”
তিনি প্রয়াত শিল্পীর পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন এবং বলেন, “এই শোক কাটিয়ে আমাদের আরও শিল্পবান, মানবিক সমাজ গড়ার পথেই এগোতে হবে—এটাই হবে স্যারের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধাঞ্জলি।”