• 09 Feb, 2026

চরিত্র বদলায়নি, কেবল চেহারা! - আবু সাঈদ দিবসের বক্তারা

চরিত্র বদলায়নি, কেবল চেহারা! - আবু সাঈদ দিবসের বক্তারা

"চরিত্র বদলায়নি, কেবল চেহারা!"—আবু সাঈদ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় এভাবেই মন্তব্য করেন বক্তারা। বক্তারা বলেন, দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পাল্টালেও প্রশাসনিক ও নৈতিক সংস্কৃতি এখনও অনেকাংশে অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগ স্মরণ করে তারা নতুন প্রজন্মকে দায়িত্বশীল, সৎ ও প্রতিবাদী হয়ে ওঠার আহ্বান জানান।

“আজ ১৬ জুলাই, ‘জুলাই শহীদ দিবস’। দিনটি উপলক্ষে সারাদেশে পালিত হচ্ছে জাতীয় শোক ও শ্রদ্ধার আনুষ্ঠানিকতা। গত বছরের এই দিনে রংপুরে ছাত্র আন্দোলনের মিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহত হন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও ছাত্রনেতা আবু সাঈদ। রাষ্ট্র তাকে ‘শহীদ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।”

কোটাবিরোধী আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে নিহত ছাত্রনেতা শহীদ আবু সাঈদের প্রথম শাহাদত বার্ষিকী উপলক্ষে নড়াইলে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (১৬ জুলাই ২০২৫) সকাল ১১টায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, সামাজিক ও ছাত্র প্রতিনিধি সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অংশ নেন।

nrailknth-16-07-2025-002.jpgজেলা প্রশাসক শারমিন আক্তার জাহানের সভাপতিত্বে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তৃতা করেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম, জেলা জামায়াতের আমির আতাউর রহমান বাচ্চু, জজ আদালতের সরকারি আইনজীবী (জিপি) অ্যাডভোকেট গোলাম মোহাম্মদ, পিপি ও নড়াইল প্রেসক্লাবের সভাপতি অ্যাডভোকেট এস এম আব্দুল হক, সিভিল সার্জন ডা. মো. আ. রশীদ, স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক জুলিয়া সুকাইনা, জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র প্রতিনিধি ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা।

বক্তারা বলেন, “বিগত ১৬-১৭ বছর ধরে দেশে একটি দমনমূলক, স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা চলেছে। শেখ হাসিনার সরকার মানুষকে বাকস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করেছে, নির্যাতন করেছে তরুণ সমাজকে। কিন্তু শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগ সেই নিঃশব্দতা ভাঙার এক প্রতীকি প্রেরণা হিসেবে আজ আমাদের পথ দেখাচ্ছে।”

তারা জানান, ১৬ জুলাই ২০২৪ সালে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে কোটা সংস্কার দাবিতে চলমান ছাত্রআন্দোলনের সময় শান্তিপূর্ণ শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ হামলা চালায়। ওইদিন আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক আবু সাঈদ দুই হাত মেলে প্রতীকী প্রতিবাদের ভঙ্গিতে দাঁড়ালে পুলিশ মাত্র ১৫ মিটার দূর থেকে তাকে গুলি করে। ঘটনাস্থলেই তিনি নিহত হন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তদন্ত প্রতিবেদনেও এই বর্বরতার সত্যতা উঠে আসে।

বক্তারা আরও বলেন, শহীদ আবু সাঈদের আত্মাহুতি আমাদের নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে — সৎ ও জবাবদিহিতাপূর্ণ সমাজ গঠনে এখনই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে। দুনিয়ার জবাবদিহির পাশাপাশি আখিরাতের জবাবদিহিও আমাদের মানসপটে রাখতে হবে।

তারা সরকারি দপ্তরে এখনও ‘স্বৈরাচারী সরকারের নিয়োগপ্রাপ্তদের’ সক্রিয় উপস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলকে সতর্ক করেন।

আলোচনা শেষে শহীদ আবু সাঈদসহ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নিহত সকলের আত্মার মাগফিরাত ও আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনায় বিশেষ দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। দোয়া পরিচালনা করেন কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতিব মাওলানা ওয়াকিউজ্জামান।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) লিংকন বিশ্বাস।

উল্লেখ্য, জনতার গণআন্দোলনের এক বছর পূর্তিতে সরকার ১৬ জুলাই দিনটিকে ‘জুলাই শহীদ দিবস’ হিসেবে ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ গত ২ জুলাই এক প্রজ্ঞাপনে জানিয়েছে, প্রতিবছর দিনটি ‘খ’ শ্রেণিভুক্ত জাতীয় দিবস হিসেবে পালিত হবে। প্রজ্ঞাপনটি স্বাক্ষর করেন উপসচিব তানিয়া আফরোজ।

দিবসটি উপলক্ষে আজ সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের বিদেশি মিশনগুলোতেও একই কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে শহীদদের আত্মার শান্তি কামনায় বিশেষ প্রার্থনা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সব মসজিদে দোয়া ও খুতবায় শহীদদের স্মরণ করা হবে, অন্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও নিজ নিজ ধর্মীয় রীতিতে প্রার্থনার আয়োজন করেছে।

শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগ ছিল এক প্রতীকী প্রতিবাদের চূড়ান্ত রূপ, যা কোটা সংস্কার আন্দোলনের এক কালজয়ী অধ্যায় হয়ে উঠেছে।

আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো হলো:
শান্তিপূর্ণ ছাত্রআন্দোলনের ওপর পুলিশের সহিংস হামলা,
১৫ মিটার দূর থেকে গুলি চালিয়ে হত্যাকাণ্ড,
অ্যামনেস্টির মানবাধিকার লঙ্ঘনের স্বীকৃতি,
শহীদের আত্মত্যাগের পর আন্দোলনের প্রতি জনমানুষের সমর্থন বৃদ্ধি,
আজও সরকারি দপ্তরে দমননীতির রেশ এবং সেটির বিরুদ্ধে সোচ্চারতা প্রয়োজন,
আন্দোলনের আদর্শিক চেতনায় জবাবদিহি, নৈতিকতা ও দ্বীনি মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার আহ্বান।

শহীদ আবু সাঈদ দিবস নতুন প্রজন্মের কাছে শুধুই শোক নয়— এটি একটি জেগে ওঠার ডাক, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার প্রেরণা।