আমরা যারা গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতার পক্ষে মত দিই, তাদের আগে প্রশ্ন করতে হবে—নিজেরা কি কখনও গণতান্ত্রিক চর্চা করেছি? পরিবার, সমাজ, কর্মক্ষেত্রে আমরা কি সত্যিই মতপ্রকাশ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণের সুযোগ দিই? গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনে অংশ নেওয়ার নাম নয়, এটি একটি জীবনচর্চা, একটি মূল্যবোধ। আর এ মূল্যবোধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সার্টিফিকেটে নয়, গড়ে ওঠে আত্মশুদ্ধি, অভ্যাস ও বিবেকবোধের মধ্য দিয়ে।
একজন প্রার্থী যদি উচ্চশিক্ষিত হন, কিন্তু তিনি যদি জনগণের দুঃখ-কষ্ট না বোঝেন, যদি মানবিকতা, সততা ও দেশপ্রেম না থাকে—তাহলে সে নেতৃত্ব জনগণের কাছে এক ধরনের প্রতারণা বৈ কিছু নয়। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরাও যদি চেয়ারে বসেই নাগরিককে অবজ্ঞা করেন, তাদের প্রতি দায়িত্বজ্ঞান না দেখান—তবে সে শিক্ষা কী কাজে এল?
আমরা যদি গ্রামের দিকে তাকাই, সেখানে দেখা যাবে—অনেক অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত মানুষ আচরণ, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধে অনেক উচ্চশিক্ষিতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। একজন প্রকৃত মানুষ, যার মধ্যে মনুষ্যত্ব, বিবেক ও ন্যায়বোধ আছে, সেই মানুষই রাষ্ট্রের আসল সম্পদ। অথচ আমাদের রাজনীতিতে এখন এসব গুণ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে।
বিশ্বের অনেক গণতান্ত্রিক দেশ যেমন সুইডেন, নরওয়ে, নিউজিল্যান্ড বা ভারতেও জনপ্রতিনিধি হতে শিক্ষাগত যোগ্যতা বাধ্যতামূলক নয়। বরং এসব দেশে গুরুত্ব পায় প্রার্থীর জনসম্পৃক্ততা, মানবিকতা ও জনকল্যাণে ভূমিকা। আমেরিকার কোনো প্রেসিডেন্ট হতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক নয়, কিন্তু সবার আগে লাগে নেতৃত্বের যোগ্যতা ও দেশপ্রেম।
সুতরাং আমাদেরও প্রশ্ন করা দরকার—আমরা কী চাই? শিক্ষিত কিন্তু দুর্নীতিপরায়ণ প্রতিনিধি, নাকি মানবিক, সাহসী ও দেশপ্রেমিক একজন প্রকৃত মানুষ? আমরা কী একটি কাগুজে সার্টিফিকেটের ওপর ভর করে রাষ্ট্র গড়ব, নাকি একটি মূল্যবোধভিত্তিক নেতৃত্ব চাই?
বাংলাদেশের সামনে এখন গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। এই সময় আমাদের চিন্তা করা দরকার—জনগণের সত্যিকার প্রতিনিধি নির্বাচিত করার জন্য দরকার বিবেকবান নাগরিক, যিনি গণতন্ত্র চর্চা করেন, মানুষের পাশে থাকেন এবং রাষ্ট্রকে মানুষের জন্য গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন।