সেই ঝড়ের দিন আমি আম কুড়াতে বেরিয়েছিলাম। আকাশে কালো মেঘ জমে উঠতে দেখে আমার মেজ ভাই প্রয়াত কাজী আফজাল হোসেন ও আমাদের বাড়ির মজিদ ভাই আমাকে আব্বা ও আমার ছোট বোন বিউটিকে আমাদের পশ্চিম পুতার আটচালা খড়ের ঘরের ভেতরে আশ্রয় নিতে বলে। এ সময় ঘরের ভেতরে একটি খাট ছিল। আমার পিতা আমাকে ও আমার ছোট বোনকে বুকে আগলে খাটের নিচে আশ্রয় নেয়। কয়েক মিনিটের ঝড় কিভাবে বয়ে গেল, তার কিছুই দেখতে পাইনি। শুধু শুনেছি ঝড় থেমে যাওয়ার পর বাইরে থেকে মানুষ আমাদের খুঁজতেছিল। তখন আমাদের বাড়িতে একজন কৃষক ছিলেন তার নাম ছিল মজিদ। তিনি এবং আমার মেজ ভাই জানতেন ওই ঘরের মধ্যে আমার বাবা, আমি আর বোন বিউটি আশ্রয় নিয়েছে, কিন্তু বের হয়নি। সময় মজিদ ভাই বললেন যদি এখনই আমাদেরকে ঘরের চাল সরিয়ে না বের করা হয় তাহল ওনারা মারা যেতে পারে।” পরে সবাই মিলে ঘরের চাল সরিয়ে আমাদের উদ্ধার করে। সেই থেকে আজও আমি বেঁচে আছি—সেই আশ্চর্য অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে।
এরপর শুরু হলো আমার জীবনে একের পর এক আপনজন হারানোর গল্প। কোন এক রাতে আমার মরহুম মামা হাবিবুর রহমান হারিকেন হাতে আমাদের বাড়িতে এসে আমার মাকে ডাক দিলেন—“কুলসুম! কুলসুম!”
আমার মা ঘুমের ঘোরে উত্তর দিলেন, “আমার নবীর মনে আর নেই…”। মা কি করে বুঝলেন জানি না। সন্তানের খবর হয়তো মায়ের মনে আগে এসে পৌঁছায়। ঐদিন আমার ভাই নবীর এসএসসি পরীক্ষার ফরম ফিলআপ করে নানা বাড়িতে আসে। নবীর ভাই নানার বাড়ি থেকে নলদী শ্যামাসুন্দর মাধ্যমিক বিদ্যালয় পড়াশোনা করতেন। যে রাতে খবর পেলাম ওই রাতে নবীর ভাই ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। সকালে আমরা গিয়ে দেখলাম, ভাই চিরনিদ্রায় শুয়ে আছে, তার শরীর নীল হয়ে গেছে। নবীর ভাই আমার নানার খুবই আদরের নাতি ছিল। তার এই অকাল মৃত্যুতে নানা আলহাজ্ব গফুর মোল্লা ভেঙে পড়েন। ওই সময় তিনি বলে ফেলেন আমার ভাই যখন চলে গেছে “আমার হয়তো আর এক সপ্তাহ আমার হাতে সময় আছে।” সেদিনকার নানার কথাটি খেটে যায় । এক সপ্তাহ পর নানা আলহাজ্ব গফুর মোল্লা না ফেরার দেশে চলে জান। এরপর কয়েক বছর পর হারালাম নানীকে। এরপর কোন এক সালের একুশে ফেব্রুয়ারির রাতে আমার মেজ ভাইয়ের স্ত্রী জোহরা বেগমকেও হারালাম। এভাবে ক্রমান্বয়ে হারাতে শুরু করলাম একে একে সব প্রিয়জনদের।
এরপর ১৯৯৩ সালের ৫ জানুয়ারি হারালাম আমার প্রিয় বাবাকে। এরপর আমার ইমিডিয়েট বড় ভাই ওমর হোসেনকে, তারপর আমার মা, মেজ ভাই কাজী আফজাল হোসেন, আর সর্বশেষ আজ শনিবার ১৬ ই আগস্ট ২০২৫ ভোরে আমার বড় ভাই কাজী আব্দুর রাজ্জাক ভাইকেও হারালাম।
আজ আমি ৬৪ বছরের এক দীর্ঘ পথ পেরিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। আমার বংশের নিয়ম যেন বলছে—এবার আমার যাবার পালা। আমরা এখনো তিন ভাই, দুই বোন রয়েছি। এছাড়া ভাইদের ছেলে-মেয়ে, বোনের ছেলে মেয়ে সহ নাতিপোতা পুথনি অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন রয়েছ এ ধরাধামে।
তারপরও আজ মনে হলো আমার কোথাও বসে বিশ্রাম নেয়ার মত নির্ভরতা স্থান নেই। এই শূন্যতা আমাকে থমকে দাঁড় করিয়েছে জীবনের এই সন্ধিক্ষণে। ভাইয়ের মরদেহ তার শহরের ভওয়াখালি বাড়ি থেকে এনে গ্রামের বাড়ি নড়াইল সদরের চণ্ডিবরপুর ইউনিয়নের নাওরা গ্রামের পৈত্রিক ভিটায় পারিবারিক কবরস্থানে দাফন কার্য সম্পন্ন করে নির্জনে বসে একাএকি আমি নিজেকেই বললাম— “এভাবে জীবন কাটিও না আর। নিজেকে গুছিয়ে নাও। মানবতার সাথে যে কাজগুলো করছ, সেগুলো চালিয়ে যাও। মনে রেখো, একদিন চলে যেতে হবে পরপারে। সেখানে তোমার অবস্থান কোথায় হবে, সেটার জন্য প্রস্তুত হও। জীবনের বাকি সময়টা সততা, ন্যায্যতা আর মানবিকতার সঙ্গে কাটিয়ে দাও।”
“এই হলো আমার জীবনের গল্প— সেই গাছবাড়িয়া ঝড় থেকে বেঁচে ফেরা, একের পর এক আপনজন হারানো, আর শেষ বয়সে এসে মানবতার দায় বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক মানুষ” আমি।
"হে আমার বিশ্ব বিবেক তুমি আমাকে তোমার শ্রেষ্ঠটা দান করো যার দ্বারা আমি তোমার সৃষ্টির ১৮ হাজার মাখলুকাতের ন্যূনতম যেসব দায়িত্ব তুমি অর্পণ করেছ সৃষ্টির সেরা জীব মানুষকে সেটা যাতে আমি অক্ষরে অক্ষরে বাকি যে সময়টুকু তুমি আমার জন্য বরাদ্দ রেখেছো সেই সময়টুকুতে যেন আমি তোমার দেওয়া দায়িত্বটা পালন করে তোমার কাছে আসতে পারি। তুমি পরম করুণাময় দয়ালু তুমি ইচ্ছা করলে সবই করতে পারো। " তুমি আমার প্রার্থনা কবুল করো আমিন।