• 09 Feb, 2026

কিছু সংখ্যক চাকরিজীবীদের অর্থবৈভব, নাগরিক সচেতনতা ও বৈষম্যের বাস্তবতা!

কিছু সংখ্যক চাকরিজীবীদের অর্থবৈভব, নাগরিক সচেতনতা ও বৈষম্যের বাস্তবতা!

বাংলাদেশে সরকারি চাকরি একটি আকাঙ্ক্ষিত পেশা। সীমিত সংখ্যক পদ, নিয়মিত বেতন, অবসর-সুবিধা এবং সামাজিক মর্যাদার কারণে এ চাকরি সমাজে বিশেষ কদর পায়। কিন্তু একই সঙ্গে একটি অস্বীকার করা যায় না এমন বাস্তবতাও আছে— অনেক সরকারি কর্মকর্তা তাদের বৈধ আয়ের বাইরে গিয়ে অঢেল অর্থ ও সম্পদের মালিক হচ্ছেন। এ বৈভবের উৎস কোথায়, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন থাকলেও, সরাসরি জিজ্ঞেস করার সাহস খুব কম মানুষেরই থাকে।

বাংলাদেশে সরকারি চাকরি একটি আকাঙ্ক্ষিত পেশা। সীমিত সংখ্যক  পদ, নিয়মিত বেতন, অবসর-সুবিধা এবং সামাজিক মর্যাদার কারণে এ চাকরি সমাজে বিশেষ কদর পায়। কিন্তু একই সঙ্গে একটি অস্বীকার করা যায় না এমন বাস্তবতাও আছে— অনেক সরকারি কর্মকর্তা তাদের বৈধ আয়ের বাইরে গিয়ে অঢেল অর্থ ও সম্পদের মালিক হচ্ছেন। এ বৈভবের উৎস কোথায়, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন থাকলেও, সরাসরি জিজ্ঞেস করার সাহস বা সুযোগ খুব কম মানুষেরই থাকে।

সরকারি চাকরির সংখ্যার বাস্তব চিত্র:
বাংলাদেশে প্রায় ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে মাত্র প্রায় ১৪-১৫ লাখ সরকারি চাকরিজীবী আছেন, যা মোট জনসংখ্যার ১ শতাংশেরও কম। অর্থাৎ দেশের ৯৯ শতাংশ মানুষ কৃষি, ব্যবসা, প্রবাস, দিনমজুরি, পরিবহন কিংবা ক্ষুদ্র পেশায় জীবিকা নির্বাহ করেন। এ তুলনায় সরকারি চাকরিজীবীরা সংখ্যায় অল্প হলেও, প্রভাব ও মর্যাদায় অনেক শক্ত অবস্থানে আছেন।

বৈভবের উৎস ও জনমুগ্ধতা:
আমাদের সমাজে দেখা যায়, একজন কর্মকর্তা চাকরির পাশাপাশি এলাকায় সামাজিক কাজে যুক্ত হন। এতিমখানা ভিজিট, ঈদের সময় উপহার বিতরণ, ক্রীড়া বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অর্থ সহায়তা—এসব কর্মকাণ্ডে তিনি দ্রুত সুনাম কুড়িয়ে নেন। সাধারণ মানুষ মুগ্ধ হয়ে মনে করেন তিনি “অসাধারণ দানশীল” ব্যক্তি।

কিন্তু প্রশ্ন হলো— তার মাসিক বেতন কত, আর ওই বেতনের টাকায় এ রকম আয়োজনের সামর্থ্য কতটুকু? একজন প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা চাকরির শেষ পর্যায়ে মাসে সর্বোচ্চ ৭০-৮০ হাজার টাকা পান। সেই টাকায় সংসার চালানো, সন্তানের পড়ালেখা, চিকিৎসা ও জীবনের স্বাভাবিক খরচ মেটানোর পর বিলাসবহুল বাড়ি-গাড়ি, জমি কেনা বা এলাকায় দান-খয়রাত চালানো সম্ভব নয়। অথচ মৃত্যুর পর কিংবা বিপদে পড়লে আমরা শুনি— তার একাধিক ফ্ল্যাট, শহরে দালান, গ্রামে বিস্তীর্ণ জমি। প্রশ্ন থেকে যায়, এ সম্পদের উৎস কোথায়?

প্রজাতন্ত্রের চাকরিজীবীর ভূমিকা:
সংবিধান অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা হলেন প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী—অর্থাৎ জনগণের সেবক। জনগণের করের টাকাই তার বেতন। কাজেই জনগণকে স্বজনপ্রীতি বা ব্যক্তিগত খুশি করার মাধ্যমে নয়, বরং স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও ন্যায়সঙ্গত সেবা দেওয়ার মাধ্যমেই দায়িত্ব পালন করা উচিত।

কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যায়—
কেউ চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ হাতিয়ে নেন।
কেউ ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে দুর্নীতির আশ্রয় নেন।
কেউ অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে সাধারণ মানুষের চোখে ধুলো দেন।
এভাবে তারা নিজেদেরকে দাতা বা জনহিতৈষী হিসেবে তুলে ধরলেও প্রকৃত অর্থে জনগণের টাকা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেন।

বৈষম্যের বিস্তার:
এই অনৈতিক আচরণের কারণে সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য দিন দিন বাড়ছে।
উচ্চপদস্থ কিছু কর্মকর্তা এবং রাষ্ট্রের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বিপুল সম্পদের মালিক হচ্ছেন।
অন্যদিকে সাধারণ কৃষক, দিনমজুর, ভ্যানচালক কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সংগ্রামে দিন কাটাচ্ছেন।
গরিব আরও গরিব হচ্ছে, আর ধনী আরও ধনী।

এটি শুধু অর্থনৈতিক বৈষম্য নয়, সামাজিক বৈষম্যকেও তীব্র করে তোলে।
নাগরিকদের করণীয় ও সচেতনতার জায়গা:
এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে নাগরিকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
১. সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা – শুধু বাহ্যিক দান-খয়রাত দেখে কাউকে “মহৎ” বলা যাবে না। তার বৈভবের উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন।
২. জবাবদিহিতা দাবি করা – সরকারি কর্মকর্তারা জনগণের টাকায় বেতন পান। তাই তাদের কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা থাকা বাধ্যতামূলক। নাগরিকদের উচিত জবাবদিহিতা দাবি করা।
৩. দুর্নীতি প্রতিরোধে সোচ্চার হওয়া – গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন ও নাগরিক সমাজের মাধ্যমে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে।
৪. নিজেদের মানসিকতা পরিবর্তন করা – আমরা যেন অবৈধ অর্থে আয়োজিত অনুষ্ঠান বা উপহারকে বাহবা না দিই। বরং সৎ ও স্বচ্ছ আচরণকে মূল্যায়ন করি।
৫. আইন ও নীতিমালা শক্তিশালী করা – দুর্নীতি দমন কমিশন ও অন্যান্য তদারকি সংস্থার কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য নাগরিক চাপ প্রয়োজন।

উপসংহার:
একজন সরকারি কর্মকর্তা এবং প্রভাবশালীন ব্যক্তিরা যদি তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেন, তবে সেটাই জনগণের জন্য বড় সেবা। অঢেল অর্থবৈভব, অবৈধ দান-খয়রাত বা চাকরি বাণিজ্যের মাধ্যমে নয়। আমাদের সচেতনতা, জবাবদিহিতার দাবি এবং সৎ মানুষকে সম্মান দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি করতে পারলেই বৈষম্য কমবে।

রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকারের দাবিদার। তাই যেসব কর্মকর্তা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অবৈধভাবে সম্পদ সঞ্চয় করে সামাজিক বাহবা পান, তাদের প্রতি মুগ্ধ না হয়ে বরং প্রশ্ন তোলা ও সচেতন হওয়াই একজন প্রকৃত নাগরিকের করণীয়।

লেখক : কাজী হাফিজুর রহমান, সম্পাদক নড়াইলকন্ঠ।